Tuesday, 3 November 2020

ব্যাগ নির্মাতা ডলি রায়ের লম ডাউনের দিন

 ব্যাগ নির্মাতা ডলি রায়ের লকডাউন যাপন

ভাইরাস মুক্ত পৃথিবী  নাগালে এসে যাবে! হয়ত অপেক্ষা আরও কিছুদিন। এক কঠিন আর্থিক পরিস্থিতির সঙ্গে লড়ছে মহিলা উদ্যোক্তারা। প্রায় যুদ্ধকালীন অবস্থার মোকাবিলায় নেমেছেন তারা। এন্ট্রেপ্রেনার দের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলি  ধুঁকছে!৩৫  বছরের সমৃদ্ধ ব্যাগ প্রতিষ্ঠান ডলি ও দিলীপ রায়ের। দীর্ঘ নয় মাস ধরে কোনো অর্ডার নেই। কতদিন এভাবে চলবে কেউ জানেনা!  মুখ ধুবড়ে পড়েছে পরিকাঠামো। মনোবল হারিয়েছে ডলির মেয়েরা। 

বিয়ের পরেই স্বামীর  সংস্থা  সামলানোর দায়িত্ব এসে পড়ে ডলির উপর। একশোর বেশি মেয়েকে নিয়ে চলতে থাকে কাঁথা স্টিচের ব্যাগের কাজ। ভারতের সর্বত্র এই ব্যাগের চালান ছিল রমরমিয়ে। এখন প্রতিদিন মেয়েরা কাজ শুরু কবে জিজ্ঞাসায় কড়া নাড়ছে। ডলিও মানসিক ভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত। উত্তর নেই কোনো কবে থেকে আসলে কাজ শুরু!

ঘরের প্রোডাক্ট বন্ধ অবস্থায় পড়ে। ডলিদির স্বামী একদা নিজের প্রোডাকশনের দেশব্যাপী মার্কেটিং করেছেন। তিনিও কিছুটা ক্লান্ত! অসহায় জিজ্ঞাসা কবে ঠিক হতে পারে অবস্থা! অর্ডার আবার কবে আসতে শুরু করবে!  ডলিদিও কার্যত হতাশ। ডলিদি জানায় ২০০০ সালে বন্যার সময় বস্তা বস্তা সিল্কের কাপড় ফেলতে হয়েছিল তবুও এমন পরিস্থিতি হয়নি।  লকডাউন একেবারে উদ্যোক্তাদের মেরুদন্ডে আঘাত। উঠে দাঁড়ানো দিনের পর দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

রীতিমতো সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ীরাও মুখ আড়াল করছেন। সংকট এতটাই তীব্র। ডলিদির ব্যাগ অসাধারণ। খুব আকর্ষনীয়। মেয়েদের পরিশ্রম ও মনোযোগের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। ডলিদির কাছে প্রাথমিক কাজ শেষ করার পর তা স্বামীর কারখানায় পৌছায়। সেখানেও মহিলারা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে। ডলিদি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন,"কটেজ ইন্ডাস্ট্রি  দেশের বড় ভবিষ্যৎ। মহিলা উদ্যোক্তা দের জন্য আলাদা করে ভাবনার দরকার আছে তো!"এটাও সত্য  ন্যাচারাল কালামিটি বা অন্যান্য দূর্যোগ  পরিস্থিতিতে  মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা স্কিম থাকা দরকার। ফান্ড ড্রাই এর  মোকাবিলায় সরকার হাত না বাড়ালে মেয়েরা কোথায় দাঁড়াবে! সরকারি লোনের ক্ষেত্রেও তো সাড়ে বারো শতাংশ ইন্টারেস্ট প্রাথমিকভাবে গুনতে হয় মেয়েদের। ডলিদির কথার প্রতিফলন সরাসরি মেলে বাস্তব পরিস্থিতিতে। মহিলা-প্রতিষ্ঠিত স্টার্টআপস বা কোফাউন্ডার  মহিলাদের  স্টার্টআপসের পরিমাণ ভারতীয় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের মোট বিনিয়োগের ৬ শতাংশেরও কম।

"vocal for local" সাপোর্ট করতে গেলেও ক্রয়ক্ষমতা চাই! কোভিডের কারণে ক্রেতাদের পছন্দ এখন এসেন্সিয়াল ও নন এসেন্সিয়াল দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। গ্লোবালি ৯৩% ক্রেতা মনে করছে ব্রান্ডের নন এসেন্সিয়াল স্টোর বন্ধ করা দরকার। ইতালী, স্পেনে তা অলরেডি হয়েছে।  ডলিদিদের সমস্যা দিন দিন জটিল হচ্ছে। লাক্সারি গুডসের  চাহিদা না থাকলে উৎপাদন কি করে হবে? উৎপাদন না হলে জুড়ে থাকা মহিলা কর্মীদের ঘর কী করে চলবে?

kandi,berhampore

Friday, 30 October 2020

অ্যাসিড আক্রান্ত মিলার লকডাউন যাপন

 ্মিলার লকডাউনের দিন

অসহায় বাবা  গাজন শেখ ফোনে কাঁদতে কাঁদতে জানালেন 'মিলা বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।'  যে নিয়ে পালাল সেই  ছেলেই  মিলাকে গত বছর অ্যাসিড ছুড়েছিল। আপাতত মিলা সেই  ছেলের  বাড়িতেই। মিলার পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে। পরে  মিলা  ছাড়াও  পায়। যদিও ছেলে জামিন পায় না। মিলা তখন দশম শ্রেণি। বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জানালা দিয়ে অ্যাসিড ছোঁড়া হয় মিলার মুখে। একবছর ধরে নিজে সেরে ওঠার যাবতীয় লড়াই এর পর পরিবারে মুখে হাসি ফোটে। লকডাউনের মধ্যেই মিলার নানা অসুস্থ হয়। তাকে দেখতে যাওয়ার দিনই ভোরবেলা মিলা গায়েব।


 ভাবতে অবাক লাগে এদেশে একদা সোনার আংটি বাঁকা হলেও দামি  ছিল শুধু তা নয়! অ্যাসিডে  আবার  বদমাস মেয়েরাই আক্রান্ত হয়। । কাকতালীয় ভাবে চলে যাওয়ার  দিনই মিলা আঠারো বছরের প্রাপ্তবয়স্ক  হয়।  বাবার চায়ের দোকান। লকডাউনে বন্ধ দীর্ঘদিন। ঘরে অভাব। দুই শিবির। মেয়ের পরিবার নিরক্ষর,একা। অন্যদিকে ছেলের পক্ষে সবাই। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ছেলের অ্যাসিড মারার অপরাধকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে! অপরাধী আর প্রেমিকের মধ্যে ফারাক কজনই বা করতে পারে? দেখার দৃষ্টিটাই তো গড়তে দেওয়া হয় না। এই ছেলেটি প্রথমে স্টকার ছিল। মিলাকে জোর করে বিয়ে করতে চেয়েছিল।পরিবার রাজি না হওয়ায় আক্রমণ। আমাদের দেশে এখনও  প্রতিদিন পেছনে আসা,দীর্ঘদিন ফলো করা ছেলেটিকে প্রেমিক বলেই ধরা হয়। এবং একদিন  এক স্টকারের সঙ্গেই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে! রোমান্সের এইরকম সফট চার্মেই ভুক্তভোগীরও এই  বিশ্বাস গড়ে দেওয়া হয়  যে স্বামীর আসিড ছোঁড়া হাত সংসারে পড়লে আদরের হয়ে উঠবে।

মিলার উপর ঠিক কি ধরণের চাপ এসেছিল তা এখনই হয়ত জানা গেল না! কিন্তু মিলার সঙ্গে এমপ্যাথি থাক আমাদের। এমপাওয়ারমেন্টের এও এক বড় শর্ত। মিলার জীবনের সবচেয়ে বড় ঘাতকের   হাত থেকে মিলাকে বাঁচানো গেল না। সামাজিক অপমান,পারিবারিক অভিমান?  কী সেই ভাবনা মিলাকে ঘাতকের সাহচর্যে নিয়ে গেল এবং জুড়ে দিল তা  আড়ালেই থাকল। এরপরেও কনসেন্ট, ডিসিশন মেকিং এর ক্ষমতা যদি এই জীবন গড়ে দিতে পারে! অপেক্ষা সেদিনের!এভাবেই আসিডে পুড়ে যাওয়া মেয়েগুলো খবরের শিরোণাম থেকে হারিয়ে যায়! এদের লড়াই ধীরে ধীরে পারিবারিক লক্ষণরেখায় আটকে পড়ে। মিলা হাসিমুখে  ফিরবে একদিন  সেই বৃত্তে ইতি টেনে। আশা জাগে মনে।

ভরতপুর,মূর্শিদাবাদ

  


Sunday, 11 October 2020

 বাউল শিল্পী আশালতার লকডাউনের দিন

দীর্ঘ ছয়মাস অপেক্ষা। তারপর লোকশিল্পীদের মুখে হাসি ফুটল। বাউল শিল্পী আশালতা অবশেষে বরাত পেল   প্রোগ্রামের। পর পর তিনটি। এতদিন মাসে মাসে শিল্পীভাতার হাজার টাকা জমা পড়ছিল। কিন্তু  মনে শান্তি ছিল না। ঘরে বন্ধ থাকতে থাকতে  অস্থির হচ্ছিল মন। অন্যদিকে  সামাজিক দূরত্বের কারণে দলের রেওয়াজও ছিল বন্ধ। আনলক-৫ ভাগ্যের  তালা খুলেছে আশালতার। পুজার আগেই তিনটি অনুষ্ঠানের তিন হাজার টাকা এসেছে। আশালতার  আনন্দের শেষ নেই।

লকডাউনের পর থেকেই মনমরা ছিল আশালতা। বাতিল হয়েছিল নিজেদের সাত জনের  দলের প্রোগ্রামও । অন্যদিকে সরকারি অনুষ্ঠানও ছিল বন্ধ। সব মিলিয়ে খুব কষ্টের যাপন ছিল আশালতার। স্বামী রাজমিস্ত্রীর কাজ করত। সেও বেকার বাড়িতে বসে। পারিবারিক অভাবকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল গান না গাইতে পারার কষ্ট। নিজের বলতে আশালতার এই বাউলগানটাই। আছে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সবাই স্কুলে পড়ে। কিন্তু  স্কুলও বন্ধ। পারিবারিক চাপও  ছিল আশালতার মাথার উপর। আপাতত সেসবে একটুখানি ছেদ পড়ল।



শেষমেশ আশা সব কাটিয়ে কাজে ফিরল। সূযোগও সামনে এসে গেল। পথশ্রীর জন্য,কৃষি বিলের প্রতিবাদে গান বাঁধল আশারা। সামনে দিকে চোখ সাজিয়ে এখন  আগামীর অপেক্ষা।

গনকর,মুর্শিদাবাদ

Sunday, 27 September 2020

প্রতিমা শিলপী অনামিকা,দিপালী,ছবির লকডাউনের দিন

প্রতিমা শিলপী অনামিকা,দিপালী,ছবির লকডাউন যাপন 

পুজো চলে এসেছে। কিন্তু প্রতিমাশিল্পীদের সকলেরই আগের মত হাতে কাজ নেই। গতবারই ছিল আঠেরোটি পুজার বায়না। এবারে মাত্র ছয়টি। তাও আবার আগেরবছরের তুলনায় অর্ধেকের কম বায়না। অনামিকা পটুয়া, দিপালী ও ছবি পটুয়ায় মন তাই স্বভাবতই খারাপ। স্বামীরা ঘুরে ঘুরে এর বেশি বায়না জোগাড় করতে পারেনি। আবার প্রতি বছর কয়েকটি পটুয়া ও ঘোষ ঘর মিলে নিজেদের দুর্গাপুজা হয়। সেটাও বন্ধ। দুর্গাপুজার বায়না সেরকম না মেলায় নিজেদের পুজাটারও বাজেট জোগাড় করা যায় নি। প্রায় ১২ বছরের বেশিদিন ধরে চিত্রকরদের নিজেস্ব পাড়ার দুর্গাপুজা তাই বন্ধ। মনমরা বাতাবরণ মুর্শিদাবাদ গনকর চিত্রকর পাড়ায়।


প্রতিবছরের ব্যস্ত সময়ে এবারে যোগ হয়েছে অন্য শুন্যতা। অনামিকাদের আবার কাজে বাধ সেধেছে রাস্তা। খারাপ রাস্তা দিয়ে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া কঠিন। সে ভেবেও হয়ত কেউ কেউ আসে নি ঠাকুরের অর্ডার নিতে। এমনটা দিপালীদেরও মনে হচ্ছে। প্রতিমা তৈরির ঘরানায় বাড়ির সকলে যুক্ত। দিপালী পটুয়ার মেয়ে পিয়ালী উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। মা -মেয়ে মিলে বারো দিনেই একটা ঠাকুর করে ফেলে। আট থেকে বারো হাজার টাকা ঠাকুরপিছু পায়। কাজ শেষে আড়াই থেকে চার হাজার টাকা নিজেদের থাকে। সারাবছরে দুর্গাপুজার সময় বড় উপার্জন সেটাও এবারে হল না। প্রতিমা তৈরি একমাত্র জীবিকা দীপালিদের। সেখানেও বড্ড মুশকিলের মুখোমুখি এবারে। তবুও কাজ চলছে সেই আগের উৎসাহ নিয়েই। মুখে হাসি অমলিন মহিলা পটুয়াশিল্পীদের।

গণকর,রঘুনাথগঞ্জ,মুর্শিদাবাদ

Thursday, 17 September 2020

মিড ডে মিল রাঁধুনির লকডাউন যাপন

 মিড ডে মিল রাঁধুনিপুষ্পর লকডাউনের দিন

পুষ্পরানি এক নক্ষত্রের নাম হতে পারত। কিন্তু আসলে এক  মায়ের নাম। এক সৎ ও  নিষ্ঠাবান শ্রমজীবীর নাম।  স্কুলের মুখ দেখা হয়নি! পড়াশুনা শেখা হয়নি। তাতে কি!  ছেলে এম টেক করেছে। মেয়ে এম এ পাশ করে বিএড করেছে। দুজনেই চাকরির অপেক্ষায়। লকডাউনের দিনে ছেলের চাকরি নিয়ে উদ্বিগ্ন। রান্নার গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত। সেটাও বন্ধ। তবু মিড ডে মিলের দিনগুলিতে হাজিরার ব্যস্ততা আছে। বাড়ি বাড়ি রান্নার কাজ চলছে।

প্রথমে বিড়ি বাঁধা দিয়ে উপার্জন শুরু। তারপর পরিচারিকার কাজ।  দুটি বাড়িতে  রান্নার কাজ। মিড ডে মিলের রান্নার  কাজে যোগ দেওয়া।  সংসার চালাতে অর্থের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরে ঘুরে পুষ্প জোগাড় করেছে কাজ।

উত্তরণের  গল্পগুলো কেমন যেন মেঘে ঢাকা তারার মত ভেসে ওঠার অপেক্ষায়। মুর্শিদাবাদের পুষ্পরানি হালদার  সত্যিই ওম্যানফোকের রানি। অনেক আদর আর ভালোবাসায় এই রানির আঁচল ফুলে ফুলে ভরে দেওয়ার কথা। মুখে আটকানো বাড়ির মোটা কাপড় ছেঁড়া। দুই প্রান্ত দুই দিকে  সুতো দিয়ে বেঁধে হয়েছে মাস্ক। হাতে প্রায় অকেজো এক  মোবাইল। একটা বাটন বার তিনেক ঘাটলে পরে সাড়া দেয়। তাতেই নাম্বার খুঁজে   ডায়াল করে পুষ্প। নিজের নাম্বার তো জানেই না। চোখে - মুখে একটা অসহায়তার ছাপ এসেও যেন মিলিয়ে যায়!  লড়াই এ টিঁকে থাকার এক নিরীহ দম্ভ  ফুটে ওঠে ছেলে -মেয়ের কথায়। স্বামী ঠোঙা  তৈরি করত। পাশে নেই ছয় বছরের বেশি। পুষ্পকে এই দূর্দিনও ভেঙে দিতে পারেনি। দুই সন্তানকে  সামনের দিকে এগিয়ে দিতে  নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে।

নিজের শ্রম আর খেটে খাওয়ার ক্ষমতাটুকুও জীবনের বড় সম্পদ। আর্থিক  ও সামাজিক প্রতিকূলতাকে পরাস্ত করে দিশা খুঁজে বের করতে  পুষ্প এক বড় উদাহরণ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে পরের প্রজন্মকে শিক্ষাঙ্গন থেকেই  প্রতিষ্ঠিত করার সংকল্প নেওয়া বড় কঠিন কাজ। সমাজের  প্রথম সারির অনেক মানুষের সঙ্গে তাই  পুষ্পর নাম উচ্চারণ হওয়ার কথা! জীবিকার সন্ধানে হয়ে ওঠা এক  মেইড সারভ্যান্ট  ও কুকের ছেলে এম টেক করে, মেয়ে এম এ পাশ করে তখন সমাজকে আরেক বার  এই হ্যাভস নট দের দিকে ফিরে দেখতে হয়! এক মহিলার স্বপ্ন দেখার স্পর্ধাকে কুর্নিশ করতে হয়!

জঙ্গীপুর,মুর্শিদাবাদ

Friday, 11 September 2020

রুপার লকডাউন যাপন

 রুপার লকডাউনের দিন

রূপা বর্ধন পালের কাজটা চলে গেল। লকডাউনের মধ্যেই বলে দিল -আর আসতে হবে না। একটি ডাক্তারের চেম্বারে নাম লেখার কাজ করতে রুপা। সারা ভারতেই অসংগঠিত শ্রমিকের কপালে যে দূর্ভোগ লেখা ছিল লকডাউনে  তা থেকে রেহাই পেল না রূপাও। অনেক অনুরোধের পরও থাকল না চাকরি। এক মাসের বাড়তি টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হল। এই লকডাউনে যে নিপাট বেকার থেকে কাটাতে হবে তা জানানোর  পরও মালিকের মন গলানো গেল না।  রূপা বেকার হয়ে গেল। পাঁচ হাজার টাকার চাকরিই ছিল বাবা হারা পরিবারে  রূপারএকমাত্র মেয়ের সম্বল। রূপার জীবন যুদ্ধের গল্পের মত।


মাত্র ৩০ বছর বয়স। সদ্য স্বামী  মারা গেছে। ছিল  চায়ের দোকান । যৌথ সংসার। এখন সেখানে দেওরের  মালিকানা।  মাধ্যমিক পাশ। কম্পিউটার কোর্সে  ডিপ্লোমা আছে। রুপা মাত্র ৩ বছর বয়সে পোলিও আক্রান্ত হয় ।এখনো লাঠি হাতেই হাঁটে। নিজে প্রচণ্ড লড়াই করে পড়াশুনা করেছে। বেলেঘাটায় ৬ মাস করে ট্রিটমেন্ট চলেছে। তারপর ফিরে এসে চালিয়েছে পরীক্ষা ও পড়া। রুপা নিজে খুব ঘরোয়া। নিজের শারীরিক চ্যালেঞ্জ কে হার মানিয়ে  স্বামীকে নিয়ে গেল ব্যাঙ্গালোর। স্বামী ছাড়া কেউ নেই। তাই নিজে বন্ধন  থেকে লোন নিয়ে স্বামীর চিকিৎসায় পাড়ি দিয়েছিল। কিন্তু বাঁচল না স্বামী। স্বামীর চায়ের দোকানেও বসতে  রাজি ছিল সে কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে আপত্তি থাকায় সেটাও হল না। 

অনেক জায়গায় কাজের সন্ধান করে ক্লান্ত হয়ে ফিরছে রূপা। কিন্তু লকডাউনে কাজ মেলা প্রায় অসম্ভব। এখন অপেক্ষা শুধু স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার।

বহরমপুর ,মুর্শিদাবাদ  


Saturday, 13 June 2020

ডোমেস্টিক ওয়ার্কার ললিতার লকডাউন যাপন

 ললিতার লকডাউনের দিন

লকডাউন মানুষকে হাতে হাত মিলিয়ে বাঁচতে শিখিয়েছিল। কিন্তু এই সহমর্মিতার গল্পের পাশে কিছু কান্না লুকিয়ে ছিল। ললিতার মেয়ে টিউশনির পয়সা দিতে পারেনি। তাই লকডাউনে সেই পরিবারে বাসন মেজে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছিল ললিতা মন্ডলকে।


অভাবের সংসার বরাবর ললিতার ছিল না। স্বামীর অসুস্থতায় পরিবারে নেমে আসে দূর্ভোগ। কাজ খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে ললিতা। বাধ সাধে লকডাউন। দুই মাস পর আবার কাজে নামে  ললিতা। অনেক কষ্টে মাসে মাত্র হাজার টাকা উপার্জন হয়। তাও নিশ্চিত নয় প্রতিমাসের জন্য। মাঝপথে কাজ ছাড়িয়ে দিলে টাকা মেলে না দিন হিসেবে।  শ্রমের মর্যাদা নিয়ে গলা ফাটানো এই  সমাজ কিন্তু এদের অধিকারটা বুঝিয়ে দিতে ও কড়ায় গন্ডায় মিটিতে দিতে অপরাগ। কোবিড বিপ্লবে মাস মাইনে না পেয়ে কেঁদে ফিরল রাস্তায় অগণিত মেইড সারভেন্ট। 

বিশ্বজুড়ে একই চিত্র। ইথিওপিয়া থেকে কাজে যাওয়া  ৩৭ জন মহিলা ডোমেস্টিক ওয়ার্কারকে লেবাননের রাজধানীতে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হল কিছুদিন আগেই। তাদের দেওয়া হল না কাজের পয়সা। ফিরিয়ে  দেওয়া হল না  তাদের পাসপোর্ট।  এমন কি ছুরি দিয়ে ভয় দেখানো হল দেশে ফেরার আবদারে। রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া  মহিলার কথা জানাজানি হতেই লেবাননের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, এই মেইড দের ঘরে রাখার দায়িত্ব নিয়োগকারীদের। লেবাননে  কাফালা নামের  এক সিস্টেমের  মধ্যে দিয়ে এদের নিয়োগ করার ফলে ডোমেস্টিক ওয়ার্কারদের ভিসা নিয়োগকারীর সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাই ওদের ঘরে ফেরাটা মালিকের মর্জির উপর নির্ভর করে। ওদিকে নিজের দেশ ইথিওপিয়াও এদের ফিরিয়ে নিচ্ছে না। এয়ার টিকিট শুধু ডলারে নেওয়া হয় ইথিওপিয়ায়। লেবাননে আর্থিক  সংকটের কারনে ডলার আক্সেস করা সম্ভব হচ্ছে না। দুই দেশের নিয়ম ও ব্যবস্থার ফাঁসে আটকে আছে এতজন ডোমেস্টিক স্টাফের ভাগ্য। দেশে ও দেশের বাইরে কাজের মেয়েরা এভাবেই  গভীর সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে। কাজ করেও  অপমান ও অনিশ্চয়তার  জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে ললিতারা।

মুকুন্দবাগ,মুর্শিদাবাদ 

কাথাষ্টিচ শিল্পী সোনালির লকডাউনের দিন

  কাঁথাষ্টিচ শিল্পী সোনালির লকডাউন যাপন    মেয়েদের সুন্দর মুখের নয়, সুন্দর কাজের জয়  সর্বত্র। সাফল্যের সীমানা দিগন্তপার। তাইতো সোনালীদের এত ...